শেরপুরের নার্সারি গ্রাম বয়ড়া পরানপুর ফল, ফুল আর কাঠ গাছের চারা ও কলম উৎপাদন করে শেরপুর সদর উপজেলার বয়ড়া পরানপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক উদ্যোগী ব্যক্তি গ্রামটির নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছেন নার্সারি গ্রাম হিসেবে। জেলা ও জেলার বাইরে উৎসাহব্যাঞ্জক বাজার সৃষ্টি করে নার্সারি উদ্যোক্তারা এখন স্বাবলম্বী। কয়েক বছর আগেও এদের অনেককে পরিবারের খোরাকি যোগাতে হিমশিম খেতে হতো- এখন তারা স্বচ্ছল। তাদের সন্তানেরা স্কুলে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের বাইরেও গ্রামের অনেক নারী-পুরুষের রোজগারের সুযোগ করে দিয়েছে এসব নার্সারি। নার্সারির সাফল্যে বদলে যাচ্ছে গ্রামটির চিত্র। বয়ড়া পরানপুরের বহু মানুষের জীবিকার ভিত্তি এসব নার্সারি পুঁজির সংকটের কারণে পুরোমাত্রায় বিকশিত হতে পারছে না। চারা উৎপাদন ও কলম তৈরিতে উন্নত কারিগরি প্রশিক্ষণ পায়নি নার্সারির সাথে যুক্তরা। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা এখানকার নার্সারিগুলোকে কারিগরি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অবহেলা দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুঁজির সংস্থান করে প্রয়োজনমতো কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে বয়ড়া পরানপুর গ্রাম নার্সারি ব্যবসায় আরো এগুতে পারবে বলে মনে করেন গ্রামের মানুষজন। এতে গ্রামের কয়েক শ? মানুষের রোজগারের পথটি টিকে থাকবে। পাশাপাশি উৎপাদিত চারা-কলম নির্বিঘ্নে বাজারজাত করার জন্য রাস্তাগুলোর উনয়নসহ স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার করার দাবিও উঠেছে । সরেজমিন পরিদর্শন ও নার্সারি মালিক-শ্রমিক, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। পটভূমি উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ছোট্ট মনোরম গ্রাম বয়ড়া পরানপুর। এখানে দু?শ পরিবারের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষের বাস। চর এলাকায় গড়ে ওঠা এই গ্রামে উর্বর বেলে-দোঁআশ মাটির আধিক্যের কারণে গ্রামে রবিশস্য ও তরিতরকারির চাষ হয় বেশি। এখানকার মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা খুব কম। এজন্য কৃষকরা ধান চাষ করলে উৎপাদন খরচও তুলতে পারে না। প্রায় দু? দশক ধরে ভাতশালা ইউনিয়নের এই গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০টিরও বেশি নার্সারি গড়ে উঠেছে। তবে গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই কম-বেশি বিভিন্ন জাতের গাছের চারা উৎপাদন হয়। এসব নার্সারিতে গ্রামের তিন শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানালেন নার্সারি মালিক নূর হোসেন ও কুবেদ আলী। তাঁদের কাছ থেকে আরো জানা যায়, গ্রামের প্রায় ২০ একর জমিতে নার্সারি গড়ে উঠেছে। গ্রামের অনেকেই এখন শখের বশে বাড়ির পাশে বা আঙ্গিনার টুকরো জমিতে ৫০০ থেকে এক-দেড় হাজার চারার নার্সারি গড়ে তুলেছেন। একজন আব্দুল সেক: অনেকের পথিকৃৎ ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর গ্রামটি যখন পানির নিজ থেকে জেগে উঠছিল তখন গ্রামের আব্দুল সেক ভাবতে থাকেন কীভাবে জীবিকার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা করা যায়। তাঁর এই ভাবনা থেকেই গ্রামে নার্সারির গোড়াপত্তন। নিজের ১৪ কাঠা (৭০ শতাংশ) জমিতে নার্সারি গড়ে তোলেন আব্দুল সেক। নার্সারি স্থাপনের আগে আব্দুল সেক মাটির হাড়ি-পাতিল, হলুদ-মরিচ, কাপড়সহ বিভিন্ন ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। ব্যবসায়ে মার খেয়ে কোনো দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই জমানো টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে নার্সারি শুর করেন। ছেলে নুর হোসেন ও প্রতিবেশী আসকর মোল্লা তাঁর সহযোগী হন। প্রথম বছরে চারা বিক্রি আব্দুল সেককে আরো উৎসাহী করে তোলে। ধানের চেয়ে লাভ কয়েকগুণ বেশি। প্রথম বছর চারা বিক্রি করে আয় হয় ৮৫ হাজার টাকা। আব্দুল সেকের দেখাদেখি তার ছেলে নূর হোসেন, প্রতিবেশী আসকর মোল্লা, ইন-াজ আলী, খোরশেদ আলী, কুবেদ আলী, সাদেক আলী, আমতাল আলী, রহিম উদ্দিন, হাসেম আলী, হোসেন আলী, কুদ্দুস, আব্দুর রেজ্জাক, ফরিদ মিয়া, বাহাদুর আলী, ইয়ানুছ আলী, আব্দুল মালেক, আব্বাছ আলী, শাহজাহান, ইয়ানুছ আলী, মমতাজ, আব্দুল মমিন, আব্দুর রশিদ, কেরামত আলী, অমেছ, ছোবহান, ছোরহাব আলী, ইসমাঈল হোসেন, মানিক মিয়া, বাজেত আলী ও তার ছেলে আব্দুল কাদিরসহ অনেকেই আজ সফল নার্সারি মালিক। নুর হোসেন: বাবার দেখানো পথে পেয়েছেন স্থায়ী জীবিকা ১৯৮৮ সালে আব্দুল সেকের ২৪ বছর বয়সী ছেলে নূর হোসেন বাবার পাশাপাশি ৫ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে নার্সারি গড়ে তোলেন। চড়াসুদে ধার করে ৮ হাজার টাকা পুঁজির জোগাড় করেছিলেন তিনি। কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না তাঁর। বাবা ও চাচার সহযোগিতায় নিয়ে গড়ে তোলা ছোট সেই নার্সারি থেকে প্রথম বছর আয় হয় ১৫ হাজার টাকা। বাবার মতো নুর হোসেনও হলুদ, কাঠ, কাপড়, মনোহারি দোকান, মাটির হাড়ি-পাতিলসহ অনেক ব্যবসা করেও সফল হননি। সংসারের অনটন লেগে থাকত। এখন তিনি ২ বিঘা জমি জুড়ে তাঁর নার্সারি। অর্ধেক জমি নিজের বাকিটা ইজারা নেয়া। একমাত্র ছেলে সুমন নবম শ্রেণীতে পড়ে। সব মিলিয়ে আগের চেয়ে নুর হোসেন অনেক স্বচ্ছল । আসকর মোল্লা : শ্রমিক থেকে উদ্যোক্তা আব্দুল সেকের নার্সারিতে তিন বছর কাজ করার পর আসকর মোল্লা এক কাঠা (৫ শতাংশ) জমি লিজ নিয়ে হাতে মাত্র ৩০০ টাকা নগদ নিয়ে নার্সারি শুরু করেন। খরচের চার হাজার টাকার মধ্যেই সবটাই বাকিতে ও ধার নিয়ে করেছেন। আট মাসের মাথায় চারা বিক্রি শুরু হয়। প্রথম বছরে দেনা পরিশোধসহ খরচ বাদ দিয়ে ১০ হাজার টাকা মুনাফা। প্রতি বছর অল্প অল্প করে নার্সারির আয়তন বাড়িয়েছেন আসকর মোল্লা- সেটা এখন প্রায় এক একর। এক ছেলে এক মেয়ে। বড় মেয়ে রুকসানা শেরপুর পলিটেকনিকে পড়ছে। আর দুটি সেমিস্টার শেষ করলে পাশ করবে। কন্যার লেখাপড়ার জন্য বছরে ২০-২২ টাকা খরচ হয়। ছোট ছেলেটা দু?বছর পর স্কুলে যাওয়া শুরু করবে। নার্সারির মাধ্যমে দূর হয়েছে এই পরিবারের অভাব-অনটন। ফুল-ফল-কাঠ....রকমারি চারার সমাবেশ পরানপুরে বয়ড়া পরানপুর নার্সারি গ্রামে প্রতিবছর বিভিন্ন জাতের ৫০ লাখেরও বেশি চারা উৎপাদন হয় বলে জানালেন আব্দুর রশিদ, কেরামত আলী, ইসমাঈল হোসেন ও মানিক মিয়া। গড়ে প্রতি চারা ৫ টাকা হিসেবে বছরে আড়াই কোটি টাকার চারা বিক্রি হয় বলে জানালেন তাঁরা। বয়ড়া পরানপুরের নার্সারিগুলোতে দেশি-বিদেশি জাতের ফল, কাঠ এবং ঔষধি গাছের চারা ও কলমসহ ফুলের চারাও উৎপাদিত হচ্ছে। প্রচলিত ও উন্নত জাতের ফলের মধ্যে রয়েছে কাঁঠাল, জলপাই, আম, জাম, পেয়ারা, আঙ্গুর, চালতা, নাশপাতি, লিচু, কমলা, আঙ্গুর, আপেল, সফেদা, বরই, নারকেল, জামরুল, গোলাপজাম, আমড়া, বিলাতি গাব ইত্যাদি। কাঠ গাছের মধ্যে রয়েছে মেহগনি, সেগুন, একাশিয়া, ইউক্যালিপটাস, মিলজিয়াম, শিল কড়ই, রেইন ট্রি, বকন কাঠ, শিশু, ইপিল ইপিল, লম্বু, চাম্বল, রাজ কড়ই, কদম, গর্জন, জারুল, হিজল প্রভৃতি। ঔষধির মধ্যে রয়েছে নিম, বহেড়া, হরতকি, আমলকি, অর্জুন, শিমুল, শতমূল, ঘৃত কাঞ্চন, শংখমূল, উলট কম্বল, ফনিমনসা, বাসক, নাগেশ্বর, তুলসি, তুরুপ চান্ডাল, বন কার্পাস, পাথরকুঁচি, দুধরাজ, হাড়জোড়া, পদ্মগুলঞ্চ, জস্টিমধুসহ প্রায় ৩০০ প্রজাতির ঔষধি বৃক্ষের চারা। এছাড়াও ফুলের প্রায় ১০০ প্রজাতির চারা পাওয়া যায় এই গ্রামের নার্সারিগুলোতে। এখানকার বেশ কয়েকটি নার্সারিতে আপেলকুল, বাউকুল, থাইকুল, লেবু, লিচুসহ বিভিন্ন প্রজাতির চারার কলম করা হয়। নতুন পরিচিতি: নার্সারি গ্রাম গ্রামটি এখন শেরপুর জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে বয়ড়া পরানপুর নার্সারি গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর এই পরিচিতির পেছনে যাঁদের কৃতিত্ব তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আব্দুল সেক, তার ছেলে নূর হোসেন, প্রতিবেশী আসকর মোল্লা, ইন্তাজ আলী ও সাদেক আলী। ইন্তাজ আলীর নার্সারির নাম সিদ্দিক নার্সারি। তিনি ১৯৯২ সালে তিনি ২৫ শতাংশ জমিতে নার্সারি গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে সেই নার্সারি বিস্তৃত হয়েছে প্রায় দুই একর জমিতে। প্রথম বছর তিনি বীজ, কীটনাশক ও পারিশ্রমিক মিলিয়ে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে পাঁচ হাজার বিভিন্ন জাতের চারা উৎপাদন করেন । প্রতিটি চারা গড়ে আট টাকা করে বিক্রি করে আসে ৪০ হাজার টাকা। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। তিনি জানান, নার্সারি করার আগে তিনি কৃষি কাজ করতেন। কিন্তু তখন সংসারে অভাব-অনটন লেগে থাকত। দুই ছেলে তিন মেয়েসহ তাঁর সাত সদস্যের পরিবার এখন স্বচ্ছল। সন্তানরা এখন খেয়েপরে ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারছে। ইন্তাজ আলী সব নার্সারি মালিকদের নিয়ে একটি সমিতি গড়ে তুলেছেন। সমিতির সভাপতি তিনি । তাঁর বাড়িতে ইন্টার কোঅপারেশন প্রকল্পের একটি মাতৃ গাছের বাগান রয়েছে। এ বাগান থেকে সমিতির সদস্যরা কলমের সায়ন (মাতৃগাছের কচি ডালের অংশ) ও ভালো বীজ সংগ্রহ করেন। বাগানে আম্রপালি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, মল্লিকা, বারি-১, বারি-২, র্যাড়, শ্রাবণী, ক্ষিরসাপাত, হাইব্রিড-১০, রূপসী বাংলা, দোফলা, ইন্ডিয়ান ড্রপ প্রভৃতি আম, চায়না-৩, সিঙ্গাপুর-১,২, বম্বে, দিনাজপুর বেদানা প্রভৃতি জাতের লিচু, সিডলেস, মাল্টা, কাগজী, এলাচী, সেন্ট্রিস জাতের লেবু ও আপেলকুল এবং বাউকুলর জাতের বরই রয়েছে। ইন্তাজ আলী জানান, নার্সারি উন্নয়নে আমরা সমিতি গঠন করেছি। সমিতিতে নির্দিষ্ট হারে প্রতিমাসে সদস্যরা সঞ্চয় করছেন। নার্সারির উন্নয়নের জন্য পর্যায়ক্রমে সদস্যদের মধ্যে সুদবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদান করা হবে। সমিতির মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারেও উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। যে কোনো সমস্যা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে সমাধান করা হবে। ইন্তাজ আলী বৃক্ষরোপণ আন্দোলন ও বৃক্ষমেলায় অংশ নিয়ে স্টল সজ্জার জন্য ২০০৪ থেকে ২০০৮ সময়ে পাঁচবার প্রথম স্থান অধিকার করেন। এছাড়াও তিনি কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর মেলায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পেয়েছেন । নুর হোসেন, ইন্তাজ ও সাদেক আলীসহ কয়েকজন নার্সারি উদ্যোক্তা সরাসরি ঢাকার সিদ্দিক বাজার থেকে বীজ কিনে আনেন। অন্য নার্সারি মালিকরা তাঁদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। বয়ড়া পরানপুর গ্রামে শতাধিক নারী নার্সারিতে বীজ রোপণ, চারা রোপণ, পলিব্যাগে মাটি ভরা, চারার পরিচর্যা প্রভৃতি কাজ করেন। সারাদিন কাজ করে নারীরা যা বেতন পান তা কম বলেই জানালেন নারী শ্রমিক রাশেদা, জরিনা, মমতাজ। এরপরেও নিজের এলাকায় কর্মসংস্থান হওয়ায় অনেকটাই পুষিয়ে যায় বলে জানালেন তারা। উপকরণের উচ্চমূল্য কমিয়ে দিয়েছে লাভ নার্সারি উদ্যোক্তা ইন্তাজ আলী, আব্বাছ আলী ও আব্দুল কাদিরের কাছ থেকে জানা যায়, শুরুর দিকে একটা পলিথিন প্যাকেটে বীজ বুনতে খরচ হতো এক টাকা থেকে এক টাকা ২৫ পয়সা। এক বছরে সব মিলিয়ে খরচ হতো দুই টাকার মতো। এক বছরে জাত ভেদে বিভিন্ন প্রজাতির চারা ৫ থেকে ৭ ফুট বড় হয়। বিভিন্ন আকারের প্রতিটি চারা বিক্রি হয় ছয় টাকা থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত। তবে বাউকুল, আপেলকুল, থাইকুল, আম্রপালি জাতের আম, কিছু কিছু ফুলের এবং ঔষধি গাছের চারা বিক্রি হয় আরো বেশি দামে। বর্তমানে পলিথিনসহ বীজ ও অন্যান্য নার্সারি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি চারা উৎপাদনে ৩-৪ গুণ বেশি খরচ হয়। কিন্তু চারার বিক্রয়মূল্য আগের মতোই আছে। এতে লাভের পরিমাণ অনেক কমে গেছে । জীবিকার এই অবলম্বন টিকিয়ে রাখতে নার্সারি উদ্যোক্তাদের কম লাভেই চারা বিক্রি করতে হচ্ছে। বেশিদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক নার্সারি অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে বলে আশংকা করছেন উদ্যোক্তারা। সমস্যা নার্সারি ব্যবসায় সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সমস্যার কথাও জানালেন উদ্যোক্তারা। তাঁরা জানান, নার্সারি করতে যেয়ে পুঁজি ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সমস্যা তাঁদের খুব ভুগিয়েছে। চারার বিভিন্ন রোগবালাই দমন, কলম কাটার পদ্ধতি, বীজতলা তৈরি, অঙ্কুরোদ্গম, মাটি শোধনসহ অনেক বিষয়েই তাঁদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না। দীর্ঘদিন পরে তিনজন উদ্যানত্ত্ব বিষয়ে তিন দিন প্রশিক্ষণ পান। ব্র্যাক ও ইন্টার কোঅপারেশন ফলগাছ উন্নয়ন কার্যক্রমের (এফটিআইপি) আওতায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে অনুষ্ঠি এ প্রশিক্ষণের নাম ছিল ?ফলগাছের বংশ বিস্তার, নার্সারি ও মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনা?। এছাড়া ব্র্যাক এখানকার উদ্যোক্তাদের কয়েকজনকে অন্য এলাকার সফল নার্সারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে। এতে নার্সারির বিভিন্ন কারিগরি দিক সম্পর্কে তাঁদের ধারণা হয়। এর বাইরে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার ইমপ্রোভমেন্ট (সাইপ) প্রকল্পের অধীনে এই গ্রামের একজন উদ্যোক্তাকে নার্সারির ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করে। কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে দু-একজন উদ্যোক্তা ৩০ হাজার টাকা করে ঋণ সুবিধা পেলেও বাকি উদ্যোক্তারা সরকারিভাবে কোনো আর্থিক সহযোগিতা পাননি। স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা এখানকার নার্সারি উদ্যোক্তাদের কোনোরকম কারিগরি পরামর্শ দেন না। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মীরা বয়রা পরানপুর গ্রামে যান না বলে অভিযোগ করেন নার্সারি উদ্যোক্তারা। তবে কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বৃক্ষমেলার সময় শুধু নার্সারি উদ্যোক্তাদের স্টল নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে প্রদর্শনী বাগান করার জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা চারা কিনেন। এজন্য তারা বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে চারা দেওয়ার জন্য নার্সারি মালিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে থাকেন- এমন অভিযোগও করলেন নার্সারি উদ্যোক্তারা। এছাড়া প্ল্ল্যান্ট প্রটেকশন অফিসার ও বন বিভাগের কোনো কর্মীও এখানকার নার্সারিগুলোকে কোনোরকম সহযোগিতা করে না। এ ব্যাপারে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাজমা বেগম জানান, আমি বয়ড়া পরানপুর ও ছনকান্দা এলাকায় নার্সারি মালিক ও কৃষকদের সাথে মিলেমিশে কাজ করছি। কৃষকদের যথাসাধ্য পরামর্শ ও সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট থাকি সবসময়। কম দামে চারা দেওয়ার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগসহ অন্যান্য অভিযোগগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। এ বছর বয়ড়া পরানপুর গ্রামে আইপিএম (ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট মেনেজমেন্ট) কৃষক মাঠ স্কুলে ২৫ জন কৃষক ছাত্র-ছাত্রীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে উপকারী-অপকারী পোকা চিহ্নিত করা, কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া কিভাবে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে চাষাবাদ করা যায়। তিনি আরো বলেন, নার্সারি মালিকরা প্রধানত সারের জন্যই আমাদের কাছে আসে। কিন্তু নার্সারির জন্য সারের বরাদ্দ না থাকায় আমরা অনেকটাই নিরূপায় হয়ে পড়ি। সবজির জন্য সারের বরাদ্দ রয়েছে। তাই আমরা ফসলের প্যাটার্ন চেঞ্জের জন্য সবজি ও ধান চাষেরও পরামর্শ দিয়ে থাকি। অনেক নার্সারি মালিকই এখন কিছু জমিতে সবজি চাষে করছেন। সবজি চাষও লাভজনক। বয়ড়া পরানপুর গ্রামে আমার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। নার্সারি মালিকদের পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টিও কোনো নার্সারি মালিক অস্বীকার করতে পারবে না। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বয়ড়া পরানপুর গ্রামের নার্সারিগুলোতে উৎপাদিত চারা বাজারজাত করার জন্য এখনো কোনো ভালো ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। চারা বিক্রির মৌসুমে এলাকার কাঁচা রাস্তাগুলো কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। তখন ভ্যান-ট্রলি নিয়ে দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চারা বাজারে নিতে হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার মাস চারা বিক্রির মৌসুম হলেও সারা বছরই কম-বেশি চারা বিক্রি হয়। স্থানীয় ক্রেতা ছাড়াও বয়ড়া পরানপুর গ্রাম থেকে চারা সংগ্রহ করতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফুলপুর, হালুয়াঘাট, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রৌমারী, রাজিবপুর থেকে বেপারিরা আসে। এছাড়া ব্র্যাকসহ দু-একটি অফিস দরপত্রের মাধ্যমে এই গ্রাম থেকে চারা কিনলেও স্থানীয় অন্যান্য অফিসগুলো এই গ্রাম থেকে চারা ক্রয় করে না বলে অভিযোগ করেন নার্সারি উদ্যোক্তারা। চারা বিক্রয়ের নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। ভাম্রমাণ ভ্যানে করে একেক সময় একেক জায়গায় চারা বিক্রি চলে। নার্সারিগুলোর উৎপানশীলতা বাড়ানোর জন্য যেসব সুপারিশ পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে- কলম তৈরির জন্য উন্নত মাতৃগাছের ব্যবস্থা করা, কলম তৈরিসহ উদ্যানবিদ্যার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে নার্সারির সাথে যুক্তদের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান ও এর উপকরণ সরবরাহ, সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা, রাস্তা-ঘাটের আশু উন্নয়ন ও সংস্কার, সার বরাদ্দের আওতায় নার্সারিকেও অন্তর্ভুক্ত করা, কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীসহ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধান ও পরামর্শ প্রদান। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, নার্সারি মালিকদের সব অভিযোগ সঠিক নয়। জেনেছি স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার ইমপ্রোভমেন্ট প্রজেক্ট (সাইপ) প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমি জেলার ৫০ জন নার্সারি মালিককে খুব শীঘ্রই এ অর্থবছরে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করব। জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্প এনএটিপি (ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি ট্রান্সফার প্রজেক্ট) এর আওতায়ও নার্সারি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের সাথে নার্সারি মালিকদের ঋণ প্রদানের বিষয়টি নিয়ে সমপ্রতি বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আশা করছি নার্সারি মালিকরা ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে তাদের নার্সারির পরিধি আরো বাড়াতে পারবে। আমরা উৎপাদন খরচের চাইতে কম মূল্যে চারা বিক্রি করতে কখনোই বলি না। তবে কম লাভে বিক্রি করলে চারার কাটতি বেশি হয়। এতে আমাদের বৃক্ষরোপণের হার অনেক বেড়ে যায়। ফলে পরিবেশের দিক দিয়ে আমরা বেশি লাভবান হতে পারি। এ বিষয়টি মাথায় রাখতে আমরা সবসময় নার্সারি মালিকদের উদ্বুদ্ধ করি। চাপ প্রয়োগের বিষয়টি সঠিক নয় বলে তিনি জানান। তাদেরকে যেন সারের বরাদ্দ দেওয়া যায় এ বিষয়টিও এবার মাথায় রাখা হবে।
মুগনিউর রহমান মনি
|